গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় কেয়া গ্রুপের চারটি পোশাক কারখানায় দ্বিতীয় দফায় আরও ৭৩৯ জন শ্রমিক ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। গেল সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কারখানার প্রধান ফটকে ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের নামের তালিকা সংবলিত নোটিশ টাঙিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ।
আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকাল থেকে চাকরিহারা কর্মীরা কারখানার ফটকে এসে ভিড় জমান; বছরের পর বছর ঘাম ঝরানো প্রতিষ্ঠান থেকে হঠাৎ বিদায়ের নোটিশ দেখে অনেকে কারখানার ফটকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ছাঁটাইয়ের আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, কেয়া গ্রুপের নিট কম্পোজিট ডিভিশন, স্পিনিং ডিভিশন, কটন ডিভিশন ও কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড। এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম দফায় এসব কারখানা থেকে ৬ শতাধিক (৬১৩ থেকে ৬২৭ জন) শ্রমিক-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছিল। দুই দফা মিলিয়ে কেয়া গ্রুপে ছাঁটাইয়ের শিকার কর্মীর সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়ে গেল।
হঠাৎ চাকরি হারিয়ে কারখানার ফটকে আসা সাধারণ শ্রমিকদের চোখে-মুখে এখন শুধুই অন্ধকার ও চাপা ক্ষোভ। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হয় কারখানার দীর্ঘদিনের পুরোনো কর্মীদের বিদায়ের মুহূর্তে।
প্রায় ১৯ বছর ধরে কারখানাটিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করে আসছিলেন আবেদা বেগম। জীবনের তিন ভাগের এক ভাগ সময় কেয়া গ্রুপে পার করার পর আজ ছাঁটাইয়ের তালিকা দেখে কারখানার মূল ফটকের সামনেই তিনি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। কান্নাজড়ানো কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এত বছর চাকরি করে শেষ পর্যন্ত খালি হাতে বিদায় নিতে হচ্ছে।
একইভাবে দিশেহারা কারখানার সুইং সেকশনের অপারেটর ইয়াসমিন বেগম। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এই কারখানায় শ্রম দেওয়া এই নারী শ্রমিক বলেন, ‘দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এই কারখানায় কাজ করে আসছি। এখন চাকরি হারিয়ে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব—সেটাই বুঝতে পারছি না।
একই সেকশনের অপারেটর স্বপ্না বেগম পরিবার পরিচালনা নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তার কথা ব্যক্ত করেন। আর ১০ বছর ধরে কাজ করা নজরুল ইসলাম নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘বর্তমান বাজারে নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন। যদি চাকরি না পাই, তবে পরিবার বাঁচাতে অটোরিকশা চালানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর করা নোটিশে জানানো হয়, দীর্ঘদিন ধরে চলমান ব্যাংকিং জটিলতা এবং সময়মতো গ্যাস বিল পরিশোধ করতে না পারায় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল থাকায় উৎপাদন ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন বিভাগ ও সেকশনের কিছু পদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২০ ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত শ্রমিক ও কর্মচারীদের এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে কার্যকর করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ব্যাংকিং জটিলতা ও গ্যাস সংযোগ না থাকায় গত ৬ জুন থেকেই কারখানাগুলো দফায় দফায় ‘লে-অফ’ (সাময়িক কর্মবিরতি) ঘোষণা করে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল। টানা ৫ বার লে-অফের মেয়াদ বাড়ানোর পর অবশেষে এই গণছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর করল কর্তৃপক্ষ।
পাঁচ দফায় লে-অফের পর এক নোটিশেই ৭৩৯ জন শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘৫ বার লে-অফের পর এক নোটিশে এত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা অন্যায্য। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও আইনানুগ ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পরিশোধের জোর দাবি জানাচ্ছি’ ।
তবে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দিয়ে কেয়া গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, শ্রম আইন অনুযায়ী ছাঁটাইকৃত সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আইনি পাওনাদি ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করা হবে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ নোটিশে আরও জানায়, ভবিষ্যতে কারখানায় পুনরায় কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হলে শ্রম আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী এই ছাঁটাই হওয়া দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ ছাড়া বর্তমানে যেসব কর্মীর চাকরি বহাল রয়েছে, তাঁরা লে-অফের আওতায় থাকবেন এবং আইন অনুযায়ী লে-অফ বেনিফিট পাবেন।
এদিকে বিপুলসংখ্যক কর্মী ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কারখানা এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের (শিল্প পুলিশ-২) পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে ৭৩৯ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে। কারখানা প্রাঙ্গণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত শিল্প পুলিশের পাশাপাশি গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) মোতায়েন করা হয়েছে।