পুষ্টি নিরাপত্তায় বিপ্লব ঘটিয়েছে বিএআরআই-এর ফল বিভাগের ড. মো: মশিউর রহমান

দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই)-এর ফল বিভাগ। ১৯৮৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৪১ প্রজাতির ফলের ১০৪টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিএআরআই-এর ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান ড. মো: মশিউর রহমান।
ফল উৎপাদন ও অপচয়ের চিত্র:
ড. মশিউর রহমান জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩.৬৮ লাখ হেক্টর জমিতে ফল চাষ হয়, যা মোট আবাদযোগ্য জমির মাত্র ৪.৫৫ শতাংশ। বছরে প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন ফল উৎপাদিত হলেও আধুনিক সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার অভাবে তার প্রায় ২৫-৩৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে উৎপাদিত ফল দিয়ে দেশের চাহিদার মাত্র ৪৩ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ধান বা অন্যান্য ফসলের ওপর চাপ না বাড়িয়ে ফলের উৎপাদন বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
লেবু জাতীয় ফল ও ‘বারি মাল্টা-১’
বিএআরআই উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতগুলোর মধ্যে লেবু জাতীয় ফল অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। লেবু জাতীয় ফলের পাঁচটি জাত, কাগজি লেবুর একটি, বাতাবিলেবুর ছয়টি, কমলার তিনটি, মাল্টার দুটি, জারা লেবুর একটি, সাতকরার একটি ও শরবতি লেবুর একটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
দেশীয় উদ্ভাবন ‘বারি মাল্টা-১’ সস্তা, রসালো ও পুষ্টিকর হলেও বাজারে এর কাঙ্ক্ষিত কদর না পাওয়ার পেছনে ভুল ধারণা ও অপরিপক্ব অবস্থায় ফল সংগ্রহকে দায়ী করেন ড. মশিউর। তিনি জানান, “অনেকে ভাবেন ভালো মাল্টা মানেই হলুদ। অথচ ‘বারি মাল্টা-১’-এর খোসা সবুজ হওয়ায় গ্রাহকদের আগ্রহ কম থাকে। তাছাড়া বেশি লাভের আশায় অনেকে আগস্টেই অপরিপক্ব মাল্টা বাজারজাত করেন, যা স্বাদ ও রসহীন হয়। অক্টোবর-ডিসেম্বর মাসে পরিপক্ব অবস্থায় সংগ্রহ করলে এর স্বাদ, রস ও মান চমৎকার হয়।”
অনুমোদনহীন বিদেশি চারা আমদানির ঝুঁকি
অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিদেশি চারা, কলম বা সায়ন আমদানির বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন এই বিজ্ঞানী। তিনি উল্লেখ করেন, অননুমোদিত বিদেশি চারা আমদানির ফলে দেশে ক্ষতিকর রোগ ও পোকা প্রবেশের চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, বিদেশি নারিকেলের চারা আমদানির মাধ্যমে ‘রুগোজ স্পাইরালিং হোয়াইটফ্লাই’ এবং নারিকেলের মাকড়সাসহ মারাত্মক ক্ষতিকর পোকা দেশে প্রবেশ করেছে, যা নারিকেল ডাবের উৎপাদন বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। এছাড়া সাইট্রাস ক্যানকার, কলার ফিউজারিয়াম উইল্ট, জায়ান্ট মিলিবাগ, ফল আর্মিওয়ার্ম এবং ক্ষতিকর আগাছা ‘পার্থেনিয়াম’-এর বিস্তারের জন্যও অনিয়ন্ত্রিত আমদানি দায়ী।
সম্প্রতি বিদেশি আমের জাতগুলোর মাধ্যমে ‘ব্যাকটেরিয়াল ব্ল্যাক স্পট’ রোগ দেশে প্রবেশ করেছে, যা ‘বানানা ম্যাংগো’ ও ‘কাটিমন’-এ দেখা যাচ্ছে। এটি দেশীয় জাতগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে দেশের আম খাত মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এজন্য কোয়ারেনটাইন ও সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণের জোর দাবি জানান তিনি।
সংগ্রহোত্তর অপচয় রোধ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ
বিএআরআই-এর পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ ফলের অপচয় কমাতে মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে:
১. সঠিক সময়ে সংগ্রহ: পরিপক্ব অবস্থায় ও উপযুক্ত সময়ে ফল আহরণ।
২. সংগ্রহোত্তর সংরক্ষণ: দ্রুত বাছাই, উপযুক্ত তাপমাত্রায় শীতলীকরণ ও মানসম্মত প্যাকেজিং ব্যবহার করে ফল পচন থেকে রক্ষা করা।
৩. প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজন: অতিরিক্ত ও দ্রুত পচনশীল ফল থেকে পাল্প, জুস, জ্যাম, জেলি, আচার, চাটনি, চিপস ও ক্যান্ডি তৈরি করে মূল্য সংযোজন ও কৃষকের আয় বৃদ্ধি করা।
কৃষকের কাছে চারা পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ:
বিএআরআই জাত উদ্ভাবন করে বিএডিসি (BADC) ও ডিএই (DAE)-কে মাতৃ বাগান স্থাপনের জন্য চারা সরবরাহ করে। তবে পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামোগত সমন্বয়ের অভাবে কৃষকরা সরাসরি বিএআরআই বা বিএডিসি থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ চারা পাচ্ছেন না। এ ঘাটতি মেটাতে বিএআরআই নিজস্ব উদ্যোগে আগ্রহী উদ্যোক্তা, কৃষক ও অনুমোদিত নার্সারি মালিকদের চারা-কলম ও সায়ন প্রদান করছে, যা থেকে তারা মাতৃ বাগান তৈরি করে উন্নত চারা বিস্তার করছেন।








