স্বাদে সেরা, দামে কম, লোকসানে মধুপুরের আনারস চাষি

টাঙ্গাইলের মধুপুরের আনারসের খ্যাতি দেশ ছাড়িয়ে এখন বিদেশেও। জিআই স্বীকৃত এই ফল রসে ভরা, সুগন্ধে অতুলনীয় আর স্বাদে সবার সেরা। অথচ সেই আনারসই এখন মধুপুরের বাজারে বিক্রি হচ্ছে পানির দামে। উৎপাদন খরচ থেকে কম দামেও বিক্রি করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ চাষি।
বাজারে এখন এক কেজি আপেল বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকায়, কমলা ২৮০ টাকায়। আর মধুপুরের একটা আস্ত আনারস বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকায়। বড় আকারের ভালো আনারসের দামও ৩০ থেকে ৩৫ টাকার বেশি উঠছে না। পুষ্টিগুণ আর স্বাদের দিক থেকে আপেল-কমলার চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে না থেকেও দামের দিক থেকে এটাই এখন সবচেয়ে সস্তা ফল।
মধুপুরের চাষিরা জানান, একটি আনারস ফলাতে চারা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক মিলিয়ে খরচ পড়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। অথচ বাজারে তা বিক্রি করতে হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি আনারসে চাষির লোকসান হচ্ছে ৫ থেকে ১০ টাকা।
মধুপুরের এক চাষি আক্ষেপ করে বলেন, “সারা বছর যত্ন করে ফল ফলাইলাম, এখন বাজারে নিলে দাম পাই না। আনারস ক্ষেতেই পচে যাচ্ছে।”
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার কারণে সড়ক যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে আনারস পাঠানো যাচ্ছে না। এদিকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আনারস পেকে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেছে। চাহিদা কম আর সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম তলানিতে নেমেছে।
এছাড়াও কিছু অসাধু ফল ব্যাবসায়ী অধিক লাভের আশায় আনারসে ফর্মালিন দেওয়ায় এর স্বাদ ও মান নষ্ট হওয়ায় এর চাহিদা কিছুটা কমছে।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই অবহেলিত আনারসই এখন স্পেন, পর্তুগাল, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। বিদেশের বাজারে মধুপুরের আনারসের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু দেশের বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চাষিরা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
সরকার বিষমুক্ত ও নিরাপদ ফল চাষের কথা বলছে। মধুপুরের আনারস প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত এবং ফর্মালিনমুক্ত চাষে চাষীরা বদ্ধপরিকর। তবুও মাঠ পর্যায়ে এর প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো ব্যবস্থা নেই।
কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের দাবি, মধুপুরে দ্রুত আনারস সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন করতে হবে। আনারসের জুস ফ্যাক্টরি করা হলে বাড়তি আনারস নষ্ট হবে না। একই সঙ্গে সরকারিভাবে ন্যায্য দাম নির্ধারণ করা হলে চাষিরা লাভবান হবেন।
মধুপুরের আনারস শুধু একটি ফল নয়, এই অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা। আপেল-কমলার ভিড়ে দেশের এই সেরা ফলটিকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নইলে একদিন হয়তো মধুপুরের ঐতিহ্যবাহী এই ফল হারিয়ে যাবে।








